পোশাক পরিধানে ইসলামের ১৫টি নীতিমালা-বিস্তারিতসহ
সূচীিপত্রঃ পোশাক পরিধানে ইসলামের ১৫টি নীতিমালা-বিস্তারিতসহ
ইসলামী পোশাক পরিধান কি
পোশাক পরিধানে ইসলামের ১৫টি নীতিমালা সম্মন্ধে জানার আগে আমাদের জানতে হবে ইসলামী পোশাক পরিধান কি। ইসলামী পোশাক বলতে এমন পোশাককে বোঝায় যা কুরআন ও সুন্নাহর নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী পরিধান করা হয়। অর্থাৎ এমন পোশাক যা
- শরীরের সতর ঢেকে রাখে
- অশ্লীলতা ও অহংকার থেকে মুক্ত
- নারী ও পুরুষের স্বাভাবিক পার্থক্য বজায় রাখে
- ইসলামের আদর্শ ও শালীনতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ
এই নীতিমালার আলোকে পৃথিবীর যেকোনো দেশের মুসলমান তাদের সংস্কৃতি অনুযায়ী পোশাক পরিধান করতে পারে।
আরও পড়ুনঃ রমজান মাসে করণীয় ১৩টি আমল-যেগুলো ছাড়া রোজা অসম্পন্ন
পোশাক পরিধানে ইসলামের ১৫টি নীতিমালা-বিস্তারিতসহ
১. সতর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরিধান করা
পোশাকের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো শরীরের সতর ঢেকে রাখা। পুরুষের সতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। নারীর ক্ষেত্রে পায়ের পাতা, মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জি পর্যন্ত ছাড়া পুরো শরীরই সতর। যে পোশাকে সতর প্রকাশ পায় তা পরিধান করা হারাম। নারীদের ক্ষেত্রে হিজাবের আওতা আরও বেশি। যেমন হিজাবের ক্ষেত্রে মুখও ঢেকে রাখতে হয়।
২. সতরের অংশ দৃশ্যমান না হয়
শুধু সতর ঢেকে রাখলেই হবে না; এমন পোশাক পরতে হবে যাতে শরীরের গঠন স্পষ্টভাবে বোঝা না যায়। অত্যন্ত টাইট বা পাতলা পোশাক যা শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রকাশ করে এ ধরনের পোশাক ইসলামে নিষিদ্ধ। নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে টাইট বা পাতলা পোষাক যা পরিধান করলে সতর বোঝা যায় তা পরিধান করা হারাম। যেমনঃ কোন পুরুষ এমন টাইট প্যান্ট পরল যা পরলে তার উরু প্রকাশ পায় আবার কোন নারী এমন বোরকা পরল যা পরলে তার শরীরের কোন অংশ বোঝা যায সেই সব পোষাক পরিধান করা ইসলামে নিষিদ্ধ।
৩. নারী ও পুরুষের পোশাকে পার্থক্য থাকা
ইসলাম নারী ও পুরুষের স্বাভাবিক পরিচয় বজায় রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। যে পোশাক সমাজে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট তা পুরুষদের পরা হারাম এবংযে পোশাক সমাজে পুরুষদের পোশাক হিসেবে পরিচিত তা নারীদের জন্য পরিধান করা হারাম। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সমাজে নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম নির্দিষ্ট হতে পারে।
৪. অহংকার প্রকাশ পায় এমন পোশাক না পরা
অহংকার ও বড়ত্ব প্রকাশ করে এমন পোশাক পরিধান করা ইসলামে নিষিদ্ধ। উদাহরণস্বরূপ শুধুমাত্র নিজেকে আলাদা বা বিশেষভাবে দেখানোর জন্য অস্বাভাবিক পোশাক পরা ঠিক নয়। যে সমাজে যে পোশাক প্রচলিত সেটাই পরিধান করা উত্তম। এক্ষেত্রে অন্য সমাজের আনকমন পোশাক পরিধান করলে তা ভিন্নরকম পরিবেশের সৃষ্টি করে।
৫. পুরুষদের জন্য রেশম ও স্বর্ণ নিষিদ্ধ
ইসলামে স্বর্ণ ও রেশম নারীদের জন্য বৈধ হলেও পুরুষদের জন্য তা হারাম। অতএব পুরুষরা স্বর্ণের আংটি, চেইন, ব্রেসলেট বা রেশমি পোশাক ব্যবহার করতে পারবে না। এটা ছোট বা বড় উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
৬. পুরুষদের পোশাক টাখনুর উপরে রাখা
পুরুষদের জন্য কাপড় টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পরা নিষিদ্ধ। পোশাক টাখনুর উপরে রাখা সুন্নাহ এবং অহংকার থেকে দূরে থাকার একটি শিক্ষা। অনেকে মসজিদে প্রবেশের সময় টাখনুর উপর কাপড় জড়িয়ে রাখে অথচ পুরুষদের জন্য সবসময় টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান করা হারাম। বী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। আমাদের দেশে অধিকাংশ পুরুষই এই হক মানতে পারেন না অথচ যে চাকরি এই হক মানতে বাধা দেয় সেই চাকরিও ছেড়ে দিয়ে দ্বীন পালন করার কথা ইসলামে বলা হয়েছে।
৭. নারীদের পোশাক টাখনুর নিচে থাকা
নারীদের পোশাক এমন হওয়া উচিত যা টাখনুর নিচে পর্যন্ত থাকে এবং পায়ের পাতাসহ শরীরের অংশ প্রকাশ না পায়। অথচ আমাদের দেশে নারীরা টাখনুর উপরে কাপড় পরিধান করা ফ্যাশনে পরিণত করেছে। ইসলামের নির্দেশনা নারী ও পুরুষদের ক্ষেত্রে বর্তমান সমাজে উল্টা হয়ে গিয়েছে।
৮. পোশাকে প্রাণীর ছবি না থাকা
পোশাকে কোনো প্রাণীর ছবি বা জীবন্ত বস্তুর ছবি থাকা ইসলামে নিষিদ্ধ। এ কারণে ছবি সম্বলিত গেঞ্জি, শার্ট বা অন্যান্য পোশাক পরা থেকে বিরত থাকা উচিত। ছবি বা মূর্তি সম্বলিত ঘরে রহমতের ফেরেশতা ঢুকে না। ছবি বা মূর্তি সবসময় শিরক এর দরজা খুলে দেয়।
৯. নিষিদ্ধ পোশাক শিশুদের জন্যও নিষিদ্ধ
যে পোশাক ইসলামে বড়দের জন্য নিষিদ্ধ তা শিশুদের জন্যও নিশিদ্ধ। ইসলামী শিক্ষা ছোটবেলা থেকেই শুরু করা উচিত। বয়সে ছোট দেখে আমরা বিধিবিধান এর বাহিরে শিশুদের পোষাক পরিধান করিয়ে থাকি যা ইসলাম অনুমোদন করে না।
১০. পোশাক পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন হওয়া
ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পোশাক সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে এবং নিজেকে পরিপাটি ও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে হবে। আমাদের দেশে অনেকে দীর্ঘদিন অপরিচ্ছন্ন পোষাক পরে আবার গোসল ছাড়াও অপরিচ্ছন্নভাবে চুল, নখ কাটা থেকে বিরত থাকে আবার তাদেরকে অনেকে আল্লাহর ওলি মনে করে। অথচ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ছাড়া কোন ইবাদতই কবুল হয় না।
১১. পোশাকে সরলতা ও বিনয় থাকা
পোশাকে সরলতা ও বিনয় থাকা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। অতিরিক্ত বিলাসিতা ও প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে পোশাক পরা থেকে বিরত থাকা উচিত। অনেক টাকা-পয়সা থাকলেও সমাজের সাথে মানানশই পোষাক পরিধান করাই শ্রেয়। দামী পোষাকে অনেক সময় অহংকার প্রকাশ পায়।
১২. আর্থ-সামাজিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পোশাক পরিধান করা
পোশাক এমন হওয়া উচিত যা নিজের আর্থিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আবার আর্থ-সামাজিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পোষাক পরিধান করতে হবে। পোষাক জীর্ণ-শির্ন না পরে আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং নিজের ক্রয় ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে পরিধান করতে হবে। সুযোগ থাকলে পুরনো জীর্ণ-শির্ন পোষাক পরিহার করতে হবে।
১৩. বিজাতীয় ধর্মের পোশাক অনুসরণ না করা
মুসলমানদের এমন পোশাক পরিধান করা উচিত নয় যা অন্য ধর্মের বিশেষ পরিচয় বহন করে। যেমন ধর্মীয় প্রতীক বা অন্য ধর্মের বিশেষ পোশাকের অনুকরণ করা। লাল রং এর পোষাক জায়েয নাই। লাল এর সাথে মিশ্রিত রং থাকলে তা জায়েয।
১৪. অশ্লীল বা উসকানিমূলক ডিজাইনের পোশাক না পরা
পোশাকে এমন লেখা, ছবি বা ডিজাইন থাকা উচিত নয় যা অশ্লীলতা বা অনৈতিকতা প্রচার করে।
১৫. আল্লাহর দেওয়া সৌন্দর্যকে শালীনভাবে প্রকাশ করা
ইসলাম সৌন্দর্যকে অপছন্দ করে না। বরং পরিচ্ছন্ন ও শালীন পোশাক পরিধান করা পছন্দ করে। পোশাকের মাধ্যমে শালীনতা ও সৌন্দর্যের সমন্বয় বজায় রাখা উচিত।
ইসলামে পোশাক পরিধানের গুরুত্ব
ইসলামে পোশাক শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয় এটি একজন মুসলমানের ঈমান, চরিত্র এবং ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন। পরিচ্ছন্ন ও শালীন পোশাক একজন মুসলমানের মর্যাদা বৃদ্ধি করে এবং তাকে আল্লাহর নিকট প্রিয় করে তোলে। পোশাক পরিধানে ইসলামের ১৫টি নীতিমালা সম্মন্ধে জেনে একজন মানুষ পোশাকের মাধ্যমে
- তার লজ্জাশীলতা প্রকাশ করে
- ইসলামের আদর্শ অনুসরণ করে
- সমাজে শালীনতা ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করে

স্মার্ট আইটি এরনীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url