জমিতে আগাছানাশক ব্যবহার পদ্ধতি-নিয়মকানুনসহ

জমিতে আগাছানাশক ব্যবহার পদ্ধতি এর বিষয়ে জানা বাংলাদেশের আধুনিক কৃষি উৎপাদনে সময়ের দাবী। একজন কৃষক সারা মৌসুমে যত পরিশ্রম করেন তার একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায় শুধুমাত্র জমিতে আগাছার কারণে। গবেষণায় দেখা গেছে আগাছা নিয়ন্ত্রণ না করলে ধান, গম, আলু, ভুট্টা ও শাকসবজির ফলন প্রায় ২০-৪০% পর্যন্ত কমে যায়। 

জমিতে-আগাছানাশক-ব্যবহার-পদ্ধতি-নিয়মকানুনসহ

আগাছা শুধু খাদ্য, পানি, আলো ও জায়গা দখল করে না বরং এটি পোকামাকড় ও রোগের আশ্রয়স্থল হিসেবেও কাজ করতে থাকে। ফলে ফসল ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ায় সার ও সেচের খরচ বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত কৃষকের লাভ কমে যায়। এই আর্টিকেলে আমরা ধাপে ধাপে জানবো-আগাছার ধরন, ক্ষতিকর প্রভাব, গুরুত্ব, ব্যবহার পদ্ধতি ইত্যাদি।

আগাছা কি ও কেন ক্ষতিকর

আগাছা হলো এমন অপ্রয়োজনীয় উদ্ভিদ যা মূল ফসলের সাথে জন্মায় এবং মূল ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত করে। আগাছার প্রধান ক্ষতি-

  • ফসলের খাদ্য ভাগ বসায়
  • পানি ও সার শোষণ করে নেয়
  • আলো আটকিয়ে দেয়
  • বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে
  • পোকা ও রোগের আশ্রয়স্থল তৈরি করে
  • ফসলের গাছ দুর্বল হয়
  • উৎপাদন খরচ বাড়ে
  • ফলন কমে যায় ২০-৪০% পর্যন্ত

আগাছার প্রধান ধরনগুলো (Weed Classification)

১. ঘাস জাতীয় আগাছা

এগুলো দ্রুত বাড়ে এবং ফসলের সাথে মারাত্মক প্রতিযোগিতা করে। উদাহরণঃ শ্যামা, ক্ষুদে শ্যামা, দূর্বা, বড় শ্যামা ইত্যাদি।

২. সেজেস বা মুথা জাতীয় আগাছা

এগুলো মাটির নিচে কন্দ তৈরি করে, একবার জন্মালে বারবার ফিরে আসে। উদাহরণঃ চেঁচড়া, হলদে মুথা, বড় চুচা, জয়না ইত্যাদি।

৩. চওড়া পাতা আগাছা

পাতা বড় হওয়ায় আলো ঢাকতে পারে। উদাহরণঃ শুষনি শাক, ঝিল মরিচ, চাঁদ মালা, পানি কচু, টোপাপানা ইত্যাদি।

আরও পড়ুনঃ AWD পদ্ধতিতে ধান চাষ-নিয়মকানুনসহ

জমিতে আগাছানাশক ব্যবহার পদ্ধতি’র গুরুত্ব

ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে আগাছা হলো এমন এক নীরব শত্রু যা অজান্তেই কৃষকের পরিশ্রম ও বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আগাছা ফসলের সাথে পানি, সার, আলো ও জমির জায়গা নিয়ে প্রতিযোগিতা করে এবং ধীরে ধীরে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে। সঠিক সময়ে আগাছা দমন না করলে ফলন কমে যায়, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে। আধুনিক কৃষিতে তাই জমিতে আগাছানাশক ব্যবহার পদ্ধতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।

১. ফসলের পুষ্টি নিশ্চিত করা হয়

আগাছা মাটির পুষ্টি উপাদান দ্রুত শোষণ করে নেয়। এতে মূল ফসল প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশসহ অন্যান্য খাদ্য উপাদান পায় না। আগাছানাশক প্রয়োগ করলে আগাছা দ্রুত নষ্ট হয় এবং ফসল তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে, ফলে গাছের বৃদ্ধি সুস্থ ও সবল হয়।

২. পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়

আগাছা জমির পানির বড় অংশ ব্যবহার করে ফেলে। বিশেষ করে খরার সময় এটি ফসলের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়। আগাছানাশক ব্যবহার করলে আগাছা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ফসলের জন্য পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষিত থাকে, যা ফলন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

৩. আলো-বাতাস এর প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে

ঘন আগাছা ফসলের উপর ছায়া সৃষ্টি করে, ফলে সূর্যালোক বাধাগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি বাতাস চলাচল কমে গিয়ে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়ে। আগাছানাশক ব্যবহারে জমি পরিষ্কার থাকে এবং ফসল পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস পায়, ফলে গাছ স্বাস্থ্যবান হয়।

৪. ফলন বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ কমানো হয়

আগাছা দমনে হাত নিড়ানি বা শ্রমিক ব্যবহার করলে সময় ও খরচ দুটোই বেশি লাগে। আগাছানাশক ব্যবহারে অল্প সময়ে বড় জমি পরিষ্কার করা যায়, ফলে শ্রম ব্যয় কমে এবং ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

৫. রোগ ও পোকামাকড়ের আশ্রয় কমে যায়

অনেক রোগজীবাণু ও পোকামাকড় আগাছার মধ্যে বাসা বাঁধে এবং সেখান থেকে ফসলে আক্রমণ করে। আগাছানাশক ব্যবহার করে জমি পরিষ্কার রাখলে রোগবালাই ও ক্ষতিকর পোকার বিস্তার কমে যায়, যা ফসলের সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখে।

৬. সময়মতো আগাছা দমন নিশ্চিত হয়

কৃষকের কাছে সবসময় শ্রমিক পাওয়া যায় না, বিশেষ করে মৌসুমের ব্যস্ত সময়ে। আগাছানাশক ব্যবহার করলে সঠিক সময়ে আগাছা দমন সম্ভব হয় এবং ফসল বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে কোনো বাধা সৃষ্টি হয় না।

৭. বড় জমির কার্যকর সমাধানে ব্যবহার হয়

বৃহৎ আকারের জমিতে হাতে আগাছা দমন করা প্রায় অসম্ভব। আগাছানাশক প্রয়োগের মাধ্যমে অল্প সময়ে ও কম শ্রমে বড় এলাকার আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যা আধুনিক বাণিজ্যিক কৃষিতে অপরিহার্য।

৮. সমন্বিত আগাছা ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হয়

আগাছানাশক ব্যবহারের মাধ্যমে যান্ত্রিক ও জৈব পদ্ধতির সাথে সমন্বয় করে সমন্বিত আগাছা ব্যবস্থাপনা (IWM) করা যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে জমির উর্বরতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

৯. ফলন বৃদ্ধি হয়

আগাছামুক্ত জমির ফসলের গাছ পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পায় ফলে শিকড়, কাণ্ড ও শস্য তৈরিতে ফসলে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং সামগ্রিকভাবে ফসলের ফলন সাধারণত ২০-৪০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

১০. শ্রম ও খরচ সাশ্রয় হয়

হাত দিয়ে বা যন্ত্রের সাহায্যে আগাছা পরিষ্কার করতে প্রচুর শ্রম ও সময় প্রয়োজন হয়। আগাছানাশক ব্যবহার করলে অল্প সময়ে বড় জমির আগাছা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব, ফলে শ্রমিক খরচ ও উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

ফসলের জমিতে আগাছানাশক ব্যবহার করে আগাছা দমন শুধু একটি সুবিধাজনক পদ্ধতি নয় বরং এটি ফসলের বেড়ে ওঠা, ফলন বৃদ্ধি ও কৃষকের আর্থিক লাভ নিশ্চিত করার একটি আধুনিক কৌশল। নিরাপদ ও টেকসই কৃষির জন্য অবশ্যই সঠিক মাত্রা, সঠিক সময় এবং পরিবেশবান্ধব নিয়ম মেনে আগাছানাশক ব্যবহার করতে হবে।

ধানের আগাছা দমন ব্যবস্থাপনা (Rice Weed Management)

ধানের আগাছানাশক প্রয়োগ ধানের বয়স ও জমিতে পানির উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে। ভুল সময়ে প্রয়োগ করলে ধান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ধান রোপণের ১-৭ দিন বয়সে (Pre-emergence)

প্রেটিলাক্লোর গ্রুপঃ বাজারের নাম-রিফিট ৫০০ ইসি, লাক্লোর ৫০০ ইসি, রিজিট ৫০৫ ইসি ইত্যাদি।
কাজ-আগাছার বীজ অঙ্কুরোদগম বন্ধ করে এবং নতুন আগাছা জন্মাতে দেয় না। এটি জন্মানো আগাছা দমন করে না।

ধান রোপণের ৮-২৫ দিন বয়সে (Early post-emergence)

এসিটাক্লোর + বেনসালফিউরন মিথাইলঃ বাজারের নাম-নির্মূল ১৮ ডব্লিউপি, বেনেস জি ১৮ ডব্লিউপি, সানচান্স ১৮ ডব্লিউপি ইত্যাদি।
কাজ-চওড়া পাতা ও সেজেস আগাছা দমন এবং নতুন আগাছা জন্মাতে দেয় না। সাময়িকভাবে ধান লালচে হতে পারে

ধান রোপণের ১৫-৩৫ দিন বয়সে

২,৪-ডি গ্রুপঃ রেজর ৮০ ডব্লিউপি, লাইক ৪৮ এসএল, উইডকিল ৪৮০ ইত্যাদি
কাজ-কেবল জন্মানো আগাছা দমন করে এবং এতে ধানের কোনো ক্ষতি হয় না

ধান রোপণের ১২-৩০ দিন বয়সে (Dry field)

বিসপাইরিব্যাক সোডিয়ামঃ টাইব্যাক ১০ এসসি, নগদ ৩০০ ডব্লিউপি ইত্যাদি।
শর্ত-জমিতে পানি থাকবে না এবং জমি একটু শুকনো হলে ভালো হয়। সুবিধা-ঘাস, সেজ ও চওড়া পাতা সব দমন করে থাকে।

ধানের আগাছা দমনে রাসায়নিক পদ্ধতিঃ কার্যকর ও আধুনিক সমাধান

ধান চাষের ক্ষেত্রে আগাছা একটি মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা। অনাকাঙ্ক্ষিত এই উদ্ভিদগুলো ধান গাছের সঙ্গে পানি, পুষ্টি উপাদান, আলো ও জমির জায়গা নিয়ে প্রতিযোগিতা করে, যার ফলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এ সমস্যা সমাধানের অন্যতম আধুনিক ও কার্যকর উপায় হলো রাসায়নিক পদ্ধতিতে আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা। সহজভাবে বলা যায় রাসায়নিক পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট ধরনের আগাছানাশক (Herbicide) ব্যবহার করে ক্ষতিকর আগাছাকে ধ্বংস করা হয়। এসব আগাছানাশক এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে এগুলো আগাছাকে মেরে ফেললেও ধান গাছের উপর খুব কম বা কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে না।

কেন রাসায়নিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ঃ ধান ক্ষেতে রাসায়নিক আগাছা দমন পদ্ধতি ব্যবহারের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে-

১. দ্রুত কার্যকারিতা-রাসায়নিক আগাছানাশক প্রয়োগের পর অল্প সময়ের মধ্যেই আগাছা শুকিয়ে যায় বা মরে যায়, ফলে ফসল দ্রুত স্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়

২. সহজ ও সুবিধাজনক-হাত দিয়ে আগাছা তোলার তুলনায় স্প্রে বা ছিটানোর মাধ্যমে আগাছানাশক ব্যবহার করা অনেক সহজ এবং সময় সাশ্রয়ী

৩. বড় জমিতে বেশি কার্যকর-যেসব কৃষকের বড় পরিমাণ জমি আছে তাদের জন্য রাসায়নিক পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর ও লাভজনক সমাধান

ধান ক্ষেতে ব্যবহৃত আগাছানাশকের ধরনঃ ধানের জমিতে আগাছার ধরন ও জন্মের সময় অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ধরনের আগাছানাশক ব্যবহার করা হয়-

প্রি-ইমারজেন্স আগাছানাশক-এই ধরনের আগাছানাশক ধান রোপণের আগে বা রোপণের পরপরই জমিতে প্রয়োগ করা হয়। এটি আগাছার বীজ অঙ্কুরোদগম হওয়ার আগেই নষ্ট করে দেয় ফলে নতুন আগাছা জন্মাতে পারে না।

পোস্ট-ইমারজেন্স আগাছানাশক-আগাছা যখন জমিতে গজিয়ে ওঠে, তখন এই ধরনের আগাছানাশক স্প্রে করা হয়। এটি ইতোমধ্যে বেড়ে ওঠা আগাছাকে ধ্বংস করে ফেলে

আগাছানাশক ব্যবহারের সময় সতর্কতা

রাসায়নিক আগাছা দমন কার্যকর হলেও এর সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল প্রয়োগ ফসল, পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

  • সবসময় নির্দেশিত মাত্রা অনুযায়ী আগাছানাশক ব্যবহার করুন
  • সঠিক সময়ে স্প্রে বা প্রয়োগ করুন
  • স্প্রে করার সময় মাস্ক, গ্লাভস ও সুরক্ষামূলক পোশাক ব্যবহার করুন
  • পানি, পুকুর বা জলাশয় যেন দূষিত না হয় সেদিকে বিশেষ নজর রাখুন

রাসায়নিক পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা

যদিও রাসায়নিক পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর তবুও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে-অতিরিক্ত ব্যবহারে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি থাকে, গাছা ধীরে ধীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে এবং মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়াতে পারে ইত্যাদি

বিকল্প ও সহায়ক পদ্ধতি

টেকসই কৃষির জন্য শুধু রাসায়নিক পদ্ধতির উপর নির্ভর না করে অন্যান্য পদ্ধতির সমন্বয় করা ভালো

যান্ত্রিক পদ্ধতি-হাত দিয়ে বা যন্ত্রের সাহায্যে আগাছা পরিষ্কার করা ভালো
জৈব পদ্ধতি-জৈব সার বা প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে আগাছা দমন করা হয়

ধানের সমন্বিত আগাছা ব্যবস্থাপনা (IWM)

রাসায়নিক, যান্ত্রিক ও জৈব পদ্ধতির সম্মিলিত ব্যবহার যা সবচেয় নিরাপদ ও কার্যকর। ধানের আগাছা দমনে রাসায়নিক পদ্ধতি একটি দ্রুত, সহজ ও ফলপ্রসূ সমাধান। তবে দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন টেকসই রাখতে হলে সঠিক মাত্রা, সঠিক সময় ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা মেনে চলা জরুরি। পাশাপাশি বিকল্প পদ্ধতির সমন্বয় করলে ফলন বৃদ্ধি পায় এবং জমির স্বাস্থ্য অক্ষুন্ন থাকে।

গমের আগাছা দমন পদ্ধতি (Wheat Weed Management)

গম ফসলে আগাছা দমন করা হয় দুই ধাপে-

ধাপ-১ঃ প্রি-ইমারজেন্স-বপনের পরে, চারা গজানোর আগে-আইসোপ্রোটুরন, ফ্লুফেনাসেট, ডিফ্লুফেনিকান ইত্যাদি। কাজ-সাধারণত আগাছার বীজ অঙ্কুরোদগম বন্ধ করে থাকে

ধাপ-২ঃ পোস্ট-ইমারজেন্স-চারা ৩-৫ পাতা অবস্থায়-পিনোক্সাডেন, ক্লোডিনাফপ, মেটসালফুরন-মিথাইল ইত্যাদি। কাজ হল-বন্য ওটস, রাইগ্রাস, ব্রোম, চওড়া পাতা ইত্যাদি আগাছা দমন করে থাকে।

আলুর আগাছা দমন পদ্ধতি (Potato Weed Control)

আলু ফসলের প্রথম ৩০ দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে আগাছা দমন না করলে কন্দ ছোট হয় এবং ফলন কমে যায়।

ব্যবহৃত আগাছানাশকঃ মেট্রিবুজিন (Metribuzin group)-এটির উদাহরণ হল সেনকর ৭০ ডব্লিউপি (AP-2576 Bayer)। যে সমস্ত আগাছা দমন করে সেগুলো হল-নি ঘাস, বনকপি, ক্ষুদে শ্যামা, চওড়া পাতা আগাছা ইত্যাদি। এটির প্রয়োগ সময় হচ্ছে আগাছা গজানোর পরপরই অথবা আগাছার ২-৪ পাতা অবস্থায়।

প্রয়োগ পদ্ধতি (ধাপে ধাপে)

  • জমি হালকা ভেজা থাকলে ভালো হয়
  • অল্প পানিতে ওষুধ মিশিয়ে লেই তৈরি করতে হয়
  • স্প্রে ট্যাংকে ঢেলে ভালোভাবে মিশানো হয়
  • পাতায় পাতায় ভিজে যায় এমনভাবে স্প্রে করতে হবে
  • প্রয়োগের পর ৭-১৪ দিন ফসল তুলবেন না

সুবিধা-দ্রুত আগাছা মরে যায়, দীর্ঘদিন নতুন আগাছা জন্মায় না, আলুর ফলন বাড়ে ইত্যাদি।

ভুট্টার আগাছা দমন (Maize Weed Control)

ভুট্টা চারা বড় হওয়ার সময় আগাছা থাকলে ফলন প্রায় ৩০% কমে যায়। স্প্রে করার সঠিক সময়-চারা গজানোর সাধারণত ২১ দিন পর এবং আগাছা ৩-৪ পাতা অবস্থায়।
ব্যবহৃত ওষুধ (Atrazine + Mesotrione)-ক্যালারিষ্ট এক্সট্রা ২৭.৫ এসসি, জাবা ৫৫ এসসি, প্রিজম ২৭.৫ এসসি, ডোরাস ৫৫ এসসি ইত্যাদি। মাত্রা-প্রতি লিটার পানিতে ৪ গ্রাম

লাল শাক ও পালং শাকের আগাছা দমন

শাকসবজিতে আগাছা থাকলে পুষ্টি দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তাই শাকসবজিতেও আগাছা দমন একটি প্রয়োজনীয় কাজ

ব্যবহৃত আগাছানাশক-কুইজালোফপ-পি-ইথাইল (Quizalofop-p-ethyl)। দমন করে-শ্যামা ঘাস, দূর্বা ঘাস, চিকন পাতা আগাছা ইত্যাদি। বাজারে প্রচলিত নাম-নিক্তি ৮.৮ ইসি, জি ক্লিন ৫ ইসি, টাইজালো সুপার ৫০ ইসি ইত্যাদি। সুবিধা-ফসলের ক্ষতি হয় না, বারবার ব্যবহার করা যায়, ভেজা জমিতে ভালো কাজ করে ইত্যাদি।

পতিত জমির আগাছা দমন

মুথা জাতীয় আগাছা সবচেয়ে ভয়ংকর কারণ এটি কন্দের মাধ্যমে জমিতে দ্রুত ছড়ায় এবং ফসলের ক্ষতি করে। সমাধানে ব্যবহৃত ওষধ হলো- গ্লাইফোসেট গ্রুপ-রাউন্ডআপ, টর্নেডো, টপহিট ইত্যাদি।প্রয়োগ নিয়ম-প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলি এবং আগাছার পাতায় স্প্রে করতে হবে। এটি ধান গাছে লাগলে ধানও মরে যাবে আবার ২০ দিন জমি খালি রাখতে হবে।

জমিতে আগাছানাশক ব্যবহার পদ্ধতি’র সাধারণ ভুলগুলো নিম্নরুপ

  • অতিরিক্ত মাত্রায় স্প্রে করা
  • ভুল সময়ে প্রয়োগ করা
  • বাতাসের বিপরীতে স্প্রে করা
  • পানিযুক্ত জমিতে ভুল ওষুধ ব্যবহার
  • নিরাপত্তা না মেনে স্প্রে করা

নিরাপদ আগাছানাশক ব্যবহার করার নির্দেশনাসমূহ

  • গ্লাভস, মাস্ক ব্যবহার করুন
  • খালি গায়ে স্প্রে করবেন না
  • পুকুর বা নলকূপের পানি দূষণ করবেন না
  • খালি বোতল পুনরায় ব্যবহার করবেন না
  • শিশু ও পশু থেকে দূরে রাখুন

আরও পড়ুনঃ ফসলের জমিতে পার্চিং পদ্ধতি-নিয়মকানুনসহ

শেষকথাঃ জমিতে আগাছানাশক ব্যবহার পদ্ধতি-নিয়মকানুনসহ

জমিতে আগাছানাশক ব্যবহার পদ্ধতি এক কথায় সঠিক আগাছানাশক, সঠিক সময় ও সঠিক মাত্রা এই তিনটি মেনে চললে আগাছা দমন সহজ হয় এবং ফসলের ফলন ২৫-৪০% পর্যন্ত বাড়ে। ধান, গম, আলু, ভুট্টা, লাল শাক ও পালং শাক প্রতিটি ফসলের জন্য আলাদা আগাছানাশক আছে, তাই একই ওষুধ সব জমিতে ব্যবহার করা যাবে না। আগাছানাশক ব্যবহারের আগে ফসলের বয়স ও জমির অবস্থা বুঝুন এবং প্রয়োজনে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিন মনে রাখবেন নিরাপদ কৃষি = লাভজনক কৃষি।


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

স্মার্ট আইটি এরনীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url
Md. Abir Hossain
Md. Salim Reza
একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও স্মার্ট আইটিসেবার এডমিন। তিনি অনলাইন ইনকাম, ফ্রিল্যান্সিং গাইড, লাইফস্টাইল, প্রবাস জীবন ও ভ্রমণ বিষয়ক, টেকনোলজি ইত্যাদি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। নিজেকে একজন দক্ষ ডিজিটাল মার্কেটার হিসেবে গড়ে তোলাই তিনার লক্ষ্য।